October 30, 2022

মীরা মুখোপাধ্যায়

 আমার জন্য কোনো ভালো খবর থাকতে পারে না


'তুমি বলেছিলে একটা খবর আছে '

আর আমি দৌড়াতে দৌড়াতে শহরের শেষ প্রান্তে

গিয়ে শুনি

সুচরিতা মারা গেছে 


টালমাটাল সময়ে দাঁড়িয়ে বড়বাবু ফোন করলেন

'একটা খবর আছে সুকান্ত '

গিয়ে শুনি স্ট্রাইকের অজুহাতে 

আমাদের চাকরি গিয়েছে


আজ, দেখা হলে সম্পাদক বললেন

'একটা খবর আছে আপনার '

আমি খুব শান্ত ভাবে বললাম

যে লেখাটা ছেপেছেন সেটা আমার না,

অন্য কোনো সুকান্ত সেনের

কারন, আমার জন্য কোনো ভালো খবর

থাকতে পারে না


তৈমুর খান

১.

কাঙাল 

একটু স্নেহ হবে? 

এতকাল শুধু কুয়াশায় হেঁটে হেঁটে 

কোথাও বিশ্বাস খুঁজে পাইনি 

মানুষেরা অরণ্যে গেছে, সভ্যতা এখন অরণ্যনগর 


রাস্তার বিজ্ঞাপনে কত পান্থশালার নাম 

কত সুশাসকের স্ট্যাচু এখনও বক্তৃতা দিচ্ছে 

চারপাশে এখনও কত হাততালি 


আমি অন্ধকার মেখে গড়াচ্ছি কুসুমের দিকে 

কুসুমের নরমগালের রোদে কত স্নেহ ঝরে 

পৃথিবী মাতাল হয়, সভ্যতা স্বপ্ন বিলি করে 


দু’দণ্ড বসতাম পাশে 

কয়েক কদম হেঁটে গিয়ে 

আমার মৃত মায়ের জায়নামাজে ঘুমোতাম 

কখনও কোনও পাখি ডেকে দিত ভোর হলে 

জল নিয়ে ফিরত কোনও নারী নীরব স্নেহের হ্রদে 


আজ যদি বিশ্বাস এসে কাছে দাঁড়ায় 

আজ যদি প্রসারিত হাতে বিশ্বাস বলে :

দ্যাখো, কোনও অস্ত্র নেই….. 

স্নেহমাখা কুসুম তোমার অপেক্ষায় আছে! 


২.

তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে অস্তিত্বের উপর 


গৃহস্থ মাছেরা এসে দরজা ধাক্কায় 

আমার আদৌ কি কোনও দরজা আছে? 

এই সলিলে, সময়ের বিমর্ষ সলিলে ডুবে আছি 

তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে অস্তিত্বের উপর 


দাঁত, মুখ এবং কামড় একসঙ্গে এগিয়ে আসে 

আত্মরক্ষার কিছু নেই 

অতি সামান্য ভঙ্গুর কল্পনার বাড়ি 

বাক্-বিতণ্ডায় দরজা নির্মাণ —


মাছেরা ঘাই মারে 

বৃহৎ পুচ্ছ তাড়নায় কেঁপে ওঠে আশ্রয় 

কার তবে বন্দনা করি? 

এই জলে কোথায় আছ জলেশ্বর ? 

৩.

আমার কোথাও বাড়ি নেই 


ছেলে কোলে বসে আছে মেঘ 

বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে আমি ফিরি 

সমস্ত আকাশ জুড়ে মেঘের কলোনি 

এগলি ওগলি পথে কত না কাহিনি 

শব্দের নাকছাবি পরে বসে আছে 

কল্পনার রানি 


আমার কোথাও বাড়ি নেই, দৃশ্যত অবলম্বন শুধু 

যে ডাকে তার কাছে যাই 

নক্ষত্রের গান শুনি 

জ্যোৎস্নায় যদি কারও ছোঁয়া পাই 

হিল্লোল নিয়ে এসে তবে 

ধারণায় নির্মাণ করি নতুন আশ্রয় 


কোনও কোনও বৃষ্টির রাতে 

দেখি ফিরে আসে মনের জানালায় 

অতীত স্মৃতির ধ্বনি 

আমি তার কাছে আমার সমস্ত চুমু রাখি 

আমি তাকে আবার নতুন জাগরণ পাঠাই








হামিদুল ইসলাম

দুপুর 

ছায়াডোবা স্বপ্নজালে
রঙের রোশনাই 
আমরা প্রতিদিন ছুঁয়ে দেখি ফুল পাতা জীবন।

তখনো আমার একলা বিকেল 
স্মৃতির কোঠায় খুন হয় হাজার চাঁদ 
চাপ চাপ রক্ত 
চাপ চাপ কষ্ট 
হৃদয়ের ভেতর।

তাবৎ কষ্টের মাঝে ভিজে ওঠে বুক
দুহাতে কুড়োই স্বপ্ন
দুহাতে কুড়োই বাসি ভাত ।

হাজার হাজার ভূখাপেট হাভাতের বিবর্ণ দুপুর খুঁটে খুঁটে খায়।

মাটি

কবিতার বীজধান পুঁতি 
আউশের ক্ষেত ভরে ওঠে বিশ্বাসে 
সব বোধিবৃক্ষ 
ধ‍্যানমগ্ন বুদ্ধ 
নৈরঞ্জনার পূণ‍্যতোয়া জলে ধুয়ে নিই আজন্ম নীতিকথা ।

কারা আসে কারা যায়
নদীর জলে ভাসে কাঠ কয়লা আকরিক 
আমরা দেখি শুনি। হিসেব মেলাই 
তবু জন্ম নেয় নাস্তিকের দল 
আমরাও ধীরে ধীরে বারবার বারবার নাস্তিক হয়ে যাই ।

পাপ পূণ‍্যের নতুন সংজ্ঞা সাজাই 
বার্ধক‍্যের লাঠি হাতে দেখে নিই জীবন 
উঠতে মাটি 
বসতে মাটি 
মাটি খায় কাঠ কয়লা আকরিক। মাটি খায় জীবন ।

পুরোনো বসত
                             

আমাদের সমস্ত দুঃখ কষ্ট আর যন্ত্রণা
মাঝে মাঝে ধুয়ে নিই জলে 
ডুবজলে ভাসে কথা। সূর্যের ছায়া নামে বৃহৎ দ্রাঘিমায় ।

আমাদের হৃদয়ের গভীরে পুরোনো সম্পর্ক 
বারবার ফিরে আসি সেঁজুতি বলয়
কুসুমিত মল্লভূবনে নৈরাজ্যের ছায়া। জমে ওঠে বিস্ময় একবুক ।

পড়ে থাকে জলের পুরোনো বসত 
নাবাল জমিনের ঘ্রাণ 
হরদিন পাতার কুটিরে আঁকি তারুণ‍্যের উচ্ছ্বাস। নৈঃশব্দের আদিম রাত।

হরদিন অন্দরমহলে খুঁজি 
অশ্বমেধ ঘোড়া। সমিধ আয়তক্ষেত্রে পুঁতি নির্জলা কবিতার বীজধান।


পাথর                        ্

এখনো নিজেকে খুঁজি 
এখনো খুঁজি আমার আমিকে 
আমি শূন‍্য 
অতীত   

আমার হাতে জিরাফের দাঁতের দাগ 
রক্তাক্ত জীবন 
জিরাফ অসুখ 
বারবার শাদা খামে তুলে রাখি স্বপ্নের উপমহাদেশ  

ভালোবাসার মুর্ছনা শুনি 
শিউলি ঝরা রাত 
ইট কাঠ পাথরে প্রতিদিন ভালোবাসা কুড়োই 

পাথর স্বপ্ন দেখছি 
পাথর হয়ে যাচ্ছে হৃদয়। পৃথিবী পাথর 

পাথর আমাকে চাপা দেয়। আমি চাপা পড়ে আছি জিরাফের পায়ের তলায়।      







নীলম সামন্ত

এবং কিন্তু অথবা

১.

বায়বীয় পাগলামির শেষে আলো জ্বালতেই 

ফুসফুসে ঢুকে পড়ল

parrot of life cycle 


২.

জীবন কোন ভিক্ষার দান নয় 

হতে পারে একটা মিসড কল 

কিংবা আশাবাদের কারখানা


৩.

আকাঙ্খার পরবর্তী আলোকপাত 

অপ্রকাশিত সুড়ঙ্গ 

যত রহস্য 

ততই চুম্বকত্ব 


৪.

আঘাতটুকুই দেখলে

হ্যাশট্যাগে পৃথিবী তোলপাড় 

অবসাদের গুদামঘর 

এড়িয়ে গেলে 

নির্দ্বিধায় 


৫.

We can share a cup of coffee 

Instead of red wine 

বর্ষার শেষরাতে 

গেট কিপার উপেক্ষা করে ঢুকে পড়ছে 

সিংহের গর্জন 


৬.

গাঁজা গাছটা মরে গেছে 

নেশার জন্য ছাদ ও মাদুরই যথেষ্ট 

তুমি ত্যাগ লিখবে 

আমি লুডোর ডাইসে তিন ছক্কা  

পায়ে পায়ে চলবে অতর্কিত বিশ্বযুদ্ধ...







অংশুদেব

 মা এক নির্মল আলো


ঘুমের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে পথ

শকুন উড়ছে

একাকী বালিকা পাহাড় গুহায়

আলোয় আলোর মালা গাঁথে।

খুব ক্ষিদে...

মাথায়

বুকে

পেটে

আর...

সূর্যের মিতালী বৈকালিক রঙে।


জীবনটা একটা বোঝা

বাপের দেওয়া

মায়ের দেওয়া

দেওয়া যাদের

নেওয়া তাদের

হিসেবের খাতা ঘিরে পাথর সময়

শীতের হিমে জাগে জীবন কবিতা !


তবুও বালিকা যুবতী হয়

আলোর ছবি আঁকতে গিয়ে

স্মৃতির পাতায় পাতায় কালো।

যুবতী মা হয়ে সেই অন্ধকারে

অন্ধকার ছিঁড়ে ছিঁড়ে টেনে দিল

এক নির্মল আলোর অমৃত আভরণ!


  জানুয়ারী ২০২২

চম্পাহাটি 








সোমনাথ সাহা

আপনজনের পদাবলি


"যদি না থাকত এই জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর প্রতাপ জীবনে,

আমিও খুঁজতাম সুখ, যা কিছু সে রমনীয় রুচিকর মনে।"

                                      ( বুদ্ধচরিতম্ , বন্দনা )

বাবা

বাবা আমার স্নিগ্ধ বাতাসের মতন, সমস্ত অনুভব দিয়ে তাকে অনুভব করলে বুঝতে পারি,

আমার ছেলেবেলার পাতায় লেখা আছে সেই সময়ের কথা,

যখন বাবা শীতল চাঁদের মতো শিশির ভেজা পথে দাঁড়িয়ে ছিল সৃষ্টির সিন্ধু বুকে নিয়ে; আমরা তখন স্তব্ধতার খোঁজে রাত্রির বুক চিরে চলে যেতাম কালপুরুষের কাছে।

বাবা আমাদের বিশ্বাস দিয়ে মাটির ঈশ্বর গড়তে শিখিয়ে ছিল।

আজ আমাদের নিবিড় সংযমে স্মৃতিটুকু বেঁচে আছে, আর বাবা মিশে আছে অনন্তের গভীরে।


মা

'মা'-কে নিয়ে বলতে যোগ্যতা লাগে!

যোগ্যতাহীন ব্যর্থতার শীতলতা দিয়ে যা বুঝেছি তা হলো-

মা কে দেখতাম বিকেল হলে থালা ভর্তি সন্ধ্যা সাজিয়ে রাখত; আর আমরা চার ভাইবোন একমুঠো আলো ভাগ করতে শিখতাম মায়ের কাছে।

মায়ের অস্থির মন দিনরাত ছোটাছুটি করতো একলব্যের তীরের মতন।

একই জনমে অনেক বার জন্মেছি আমি, তবুও আমার বুকের ভিতর রয়েগেছে অজস্র চোরা ঋণ।

এপারে যা কিছু সঞ্চয়, তা এপারেই রেখে যাবো, তোমার সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেবো বলে।


দাদা

স্বাধীনতা আনবে বলে সেই যে কখন ঘর ছাড়া হলো স্বাধীনতা এসেগেলো দাদা এলোনা।

আমি দেখতাম দাদা প্রতিটা অপমানের পর ফিরে আসত সাদা কাগজের বুকে।

গোলাপের রাজনীতি দাদা বোঝেনি কোনোদিন তাই তো তুচ্ছ গোলাপ মাড়িয়ে হেঁটে গেছে লজ্জা হরণ নিদ্রালোকে।

দাদা শেষে একটা চিঠিতে লিখেছিল-" ক্ষমতার দরজায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা বারণ"।


দিদি

যতটুকু আমি জানি দিদি কে ওরা বিয়ে করে পশুর মতন কেটে খেয়েছিল।

আর বাকিটুকু মায়ের মুখে নির্জনতার ভিতর রুমাল দিয়ে ছটফটিয়ে কান্না দেখে বুঝতে পারি,

অযত্নে বেড়ে ওঠা শিউলি গাছের শরীর ভর্তি ঘায়ে কারা যেনো শান্তি পাচ্ছে।

দিদির কান্নার জলে আমি আধার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বুঝতে শিখেছিলাম-

ফুলের গন্ধ ফুরিয়ে গেলে বাতাসও মুখ ফিরিয়ে চলে যায়।


বোন

বোন একজনকে ভালোবেসে বলেছিল-

"তুমি দেখো মৃত জোনাকিদের পাশে আমি গোলাপ ফুটিয়ে তুলবোই।"

বোনের প্রেম ছিল নির্জন নদীর বিষণ্ণতার মতন, হরিনের চোখে মাধুর্যের মতন।

চোখের সামনে অপেক্ষা করতে করতে বোনটি আমার শ্রুতি হয়ে গেলো,

শ্রুতি হতে হতে স্তব্ধ হয়ে গেলো,

আজ হঠাৎ দেখি স্তব্ধ হতে হতে অশরীরী চুম্বন রেখা ছুঁয়ে ফেলেছে।


কুসুম

আমাদের বুকে দোয়েল নেমে আসলেই আমার ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে কুসুম আসতো।

কুসুমের ঠোঁটে অহংকার ছুঁয়ে আমি জ্যোৎস্না ধরার চেষ্টা করতাম; পারতাম না তলিয়ে যেত ভালোবাসার মতন।

রাত বেশি হলে সংক্ষেপে চাঁদ কে ডাকতাম, অন্ধকারে ঠোঁট ভেজানো কথা বলতাম।

২১ শে ফাল্গুন চাঁদ দেখতে গিয়ে হঠাৎ আমি তোমায় দেখে ফেলেছিলাম।

তার পর আমাদের কিছু কথা তোমার কাছে বন্ধক রেখে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলাম অপেক্ষার আলিঙ্গনে।






                                          

                       

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

স্মৃতিবাসর 


স্মৃতিকথারা ডাক দিলে পর্ণ কুটিরেও চাঁদ ওঠে

একটা পানসি ভেসে যায় দারিয়াপুর

জলের সাথে তার আজন্ম গল্প বলা অফুরান

শালুকের ঝাঁক মুচকি হেসে তাকে চুমু খায়


ভিতর ঘরে শ্রাবণ এলেই স্মৃতিকথারা সরব

নিকোনো দুয়ারে পা ছড়িয়ে গল্পে মাতে

আম কাসুন্দি আর নারকেল মাখা মুড়িতে

জিভের লালায় কতো পথ জাগে


স্মৃতিকথাদের নকশি কাঁথায় বুনলেই একটা আস্ত জীবন

ফেলে আসা বটের ছায়া

ফেলে আসা পুকুর ঘাট

ফিরে আসার ধারা স্রোতে ভাসতে থাকে সুখ চারণ... 





রুষা

শেষ ট্রেন

শেষ ট্রেনের হুইসেল রাত কে বিদায় জানায়...

মিশে থাকে বিষন্নতা,

শেষ ট্রেনের যাত্রীরা বিষন্নতার একেকটি পাতা।

পসরার বোঝা ধকল মেখে চলেছে অনন্ত বিশ্রামের পথে...

তারা ঘরে ফিরছে।

শুধু বাতাসে প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে,

যারা আজ ফিরছে...

তারা কি কাল ও ফিরবে?...


নিষিদ্ধ

সম্পর্কের সংজ্ঞা থাকে...

সংজ্ঞা অনুযায়ী চলতে হয়।

নিষিদ্ধ মানব মানবী ধোঁয়া হয়ে উড়ে যায়।...

ছিঃ!

উন্মাদ তকমা

নিয়ম মেনে চলো।


নক্রচরিত

পৃথিবীর একটা দিকে পচন ধরছে

পচন ছড়িয়ে দিচ্ছে...

দিনশেষে ব্যর্থ জোকারের প্রতিচ্ছবি।

রং মাখো

খুশি থাকো

সান্ত্বনা পাও যে যার মতন।

হা নক্র!





June 26, 2022

তৈমুর খান

 দুটি কবিতা 


১.
নিজেকে দেখেছি এবার 



অসুখ থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছি দ্রুত মোটরগুলি চলে যাচ্ছে পতাকা নেই আমার
হে মানুষ, পতাকা নেই !

ঘৃণার জলে ভিজতে ভিজতে একটাও চালা নেই
সাইকেল নির্ভর জীবন
খণ্ডেৎ ত বিহীন বলে
উৎসব এল না আর



দূরের নকশা দেখে দেখে
কত পদ্ম ফুটল
চৈতন্য জাগল কলরবে
হাওয়ায় উড়ল সিংহাসন



একটা ভ্রমরের পেছনে পেছনে মধু সংগ্রহের উড়ান শুধু আর কিছু নয় 



সংশয়


সংশয় একজন বালক বলে
ওকেও মাঝে মাঝে ভিরু মনে হয় 


ব্রিজের উপর দিয়ে আমাদের গাড়িটি ছুটছে

ব্রিজও ছুটছে নাতো ?


আমরা ঝুলে আছি অনন্ত গভীরে

এখানে ভাঙা আকাশের টুকরো আর নিসর্গের নাভি স্বয়ংক্রিয় মায়াবীনিশীথ পড়ে আছে 



যেতে যেতে ভাবনারা নড়ে উঠছে 

ক্রমশ যেতে যেতে কেঁপে উঠছে আলো 

সংশয় কিছুই বোঝে না ——


 ঝুলন্ত মহুল বনেও নিশ্চুপ কোকিল 

টুপটাপ ঝরছে তার শৈল্পিক হৃদয়...




অমিত চক্রবর্তী

 আধঘন্টা নারীর আলস্যে


           “যে সব খবর নিয়ে সেবকেরা উৎসাহে অধীর,

              আধঘন্টা নারীর আলস্যে তার ঢের বেশি পাবে” – বুদ্ধদেব বসু

 

আধঘন্টার আলাপ, আলস্য বোধহয়, কিন্তু সেই কফিছাপ,

খুঁটিয়ে দেখা চড়ুইশিল্প, শার্টের হাতায় লেগে থাকে দাগ

কৌতূহলী চোখের জন্যে। দুজনে কথাটার মাঝখানে যে ফাঁক,

সেই স্পেসে এখনও ডানা মেলেনি যশ বা অমরত্ব,

টানলে বাড়ে সেই ফেব্রিক। শূন্যতার বিশেষ উপাদানই

এই। আমি একবার আঙুল তুলে দেখিয়েছিলাম উড়ে যাওয়া

পাখি, তার সঙ্কোচ, মুখটা একটু খোলা খিদেতে –

 

এনট্রপি জিতে যায় শেষে আমাদের আধ ঘন্টায়, বিরহও,

ঠোঙা ফেঁসে বাদাম গড়িয়ে পড়ে, চানাচুর,

দ্রুত গড়ায় তারা ঢালুতে তরল, কিন্তু থেমে গেলেই জমাট

বা সান্দ্র, মুখে বিদেশি ট্যুরিস্টের বোকা বোকা হাসি।

 

সত্যিই কি তুমি আমাকে কুড়িয়ে গার্বেজে ফেলে দেবে?







মীরা মুখোপাধ্যায়

 নদীর পাড়ে বাড়ি 


মৃত্যু নামের একটি নদীর পাড় ঘেঁষে 

বাড়ি বানিয়েছি আমরা।

এবেলা ওবেলা সে নদীর পাড় ভাঙে, 

ঝুপ করে তলিয়ে যায় রঙিন নির্মাণ,

অ্যাকোরিয়ামের গোল্ডফিশ অম্লজান 

প্রবেশ পথের ঘুলঘুলি বেয়ে নদীতে হারিয়ে যায়,

মৃত্যু নামের নদী....

ব্যালকনি থেকে আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি

সে নদীতে মন্দ মন্দ হাওয়া দেয়, ঢেউ ওঠে...

মজা একটাই, যার পাড় ভাঙে সে দেখতে পায় না




সব্যসাচী পণ্ডা

 লগ্ন


 লগ্নের কথা ভাবিনা আর,শুধু বলি থাকো

থাকো অনন্ত কাল

আমারই মেধায়,আমারই চেতনায়।

এই মন্ত্র বল,অযুতের নিজস্ব ছায়ায়

তারই সাধনায়

নিভৃত যাপনের গান, নিশানায় বাঁধা থাক সেই অবসর


থাকো থাকো থাকো,এই কথা বলে শুধু আমার শুদ্ধ স্বর।



তুষার ভট্টাচাৰ্য

 হৃদয়পুরে    

ভালবাসা যেন হলুদ দুপুরে নদীর জলে নাইতে নামা
কিশোরীর টলটলে মুখ,

মাটির উঠোনে ভোর শিশিরের জলে জেগে ওঠা আলতা পায়ের চিহ্ন ;
ভালবাসা যেন বইয়ের ভাঁজে লুকোনো গোলাপী চিঠি, ময়ুর পালক,
মধ্যরাত্তিরে কান্না জলে ভেজা বিরহী আনমনা কিশোর বালক ;

ভালবাসা যেন নিঝুম রাত্তিরে অলৌকিক জোছনায়  

বহুদূর থেকে ভেসে আসা নিশি ডাক,

হৃদয়পুরে নীরবে ঝরে পরা অশ্রুজল, মনস্তাপ l



অচিন্ত কর্মকার

আপেক্ষিক

ভোরের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে
যে লাবন্য ছড়ালে তুমি,তাতে রাঙা হয়ে
পুলোকিত মনে সবুজে সবুজে ভরিয়ে তোলে
আমার তিন কাঠা জমি।

নৈসর্গিক সুখের সন্ধানে পায়চারি করে
শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ ।
আমি জমির উপর দাঁড়িয়ে,খুলে দিয়ে জামা
এক পশলা বৃষ্টির অপেক্ষায়।
তির তির করে বয়ে যাবে
আমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে।
অবরুদ্ধ কণ্ঠে মুষ্টিবদ্ধ হাতে,ফিরে যাবো
এই কালো মেঘ থেকে বহু দূরে।
আগত কাশের সন্ধানে, নামহীন এক নদীর বুকে।
দু-কুল ছাপিয়ে তুমি হাত নেড়ে বিদায় জানালে,
ফিরে এসে তোমার আধভিজা চুলে একটা টগরের
ফুল গুঁজে দেবার অধিকারবোধ,ছুটে এসে বলে
আমায় ক্ষমা করো।
স্মৃতির তরণী বেয়ে নাড়া দেয়
দুঃখের আবরণে ভিজে যাওয়া বোধ।



পিঙ্কু ত্রিপাঠী

মেরুদন্ডহীন

পাহাড় ভালোবেসে সমুদ্রে আসা মেয়েটা বলতে পারেনি চিরটাকাল কি ভীষণ জলফোবিয়া ভোগে সে...

নির্ভেজাল এক দাঙ্গা সিলিং ফ্যান আর টেবিল ফ্যানের ভেতর..
ব্লেডের গায়ে ধুলোর পর ধুলো জমে তৈরী  আস্তরণ ঢেকে দেয় পোড়া ঘায়ের বালুচর..
চিংড়ির রক্তের মতোই বর্ণহীন মেয়েটার মুখ
  আর মেরুদন্ডহীন শরীর। 

             
  বি-মুগ্ধতা
                    
কবির কলমে যে বৈচিত্র খুঁজে অনায়াসে কেটে যায় এক জীবন, তার আর প্রয়োজন পরে না নামের....
যাযাবর পাখির মতই উড়ে বেড়ায় এক দেশ থেকে অন্য দেশ,
এতো কবিতা আনন্দের, বন্ধুত্বের, ভালোবাসার !
এতো মুগ্ধতা সিঁদুরে মেঘের মতোই ভয়ঙ্কর,
ঘেঁটে যাওয়া বন্ধুত্ব হোক বা চুল অনায়াসে ছড়ায় বিশৃঙ্খলা...




হামিদুল ইসলাম

পাতাঝরা দিন                                           


পাতাঝরা দিন
নক্সিকাঁথায় আঁকা ক্লান্তির মেঘ 
মেঘের শরীর জুড়ে বৃষ্টি। ভিজে যায় রাত।

বন্দরে বন্দরে কারুকাজ করা দিন 
দলিত সময় 
ছায়া ছায়া যুদ্ধ। প্রতিবাদ 
ণিজন্ত অক্ষর সম্পর্ক প্রতিদিন পুড়ে পুড়ে ছাই।

রাতের বয়েস বাড়ে 
বেড়ে যায় মনের উদ্বেগ 
বিবর্ণ প্লাটফর্ম ছেড়ে যায় রাতের শেষ ট্রেন। 

আজ বৃষ্টি নেই একফোঁটা...

February 27, 2022

তৈমুর খান

কবিতাগুচ্ছ


 ১

সাক্ষাৎকার


 ভালো করে দেখা হলো না কিছুই

 শুধু ঝরনার কাছে দু'দণ্ড বসেছি

 অবগাহন করিনি কার জলে


 এলোমেলো বাতাস, ঝরা পাতা আর পাখির গানে

 অর্ধেক বয়স পেরিয়ে গেল


 বালিশের নিচে কার চিঠি রেখেছিলাম?

 আজ আর কিছুই মনে নেই

 ঝাপসা হয়ে গেছে চোখের দৃষ্টি

 নিজেকেই আর নিজেই চিনতে পারি না


 একটা মৃত বাল্যকাল আর উত্তর না দেওয়া চিঠির অভিশাপ

 সমস্ত গোধূলি জুড়ে বিস্ময় চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে

 আমি সাক্ষাৎকার দিতে এসে শুধু নীরবতাই অবলম্বন করেছি!


 ২

ছাতা


 আমার মাথার ওপর কোনো ছাতা ছিল না

 একে একে সমস্ত বর্ষাকাল গেল

 একে একে সমস্ত গ্রীষ্মকাল গেল

 বৃষ্টি আর বজ্রের সামনে দাঁড়ালাম

 সূর্য আর তাপের সামনে দাঁড়ালাম

 

 আমাকে সবাই ভয় দেখাল

 আমাকে সবাই মৃত্যু দেখাল

 আমাকে সবাই অসুখ-বিসুখ...


 আমি ছাতা খুঁজতে খুঁজতে

 কখন নিজেই নিজের ছাতা হয়ে গেছি!


  ৩

চরিত্র


বিশ্বাস সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে

 অবিশ্বাসের দিকে চলে যাচ্ছে

 সিঁড়ির নিচে আমরা দোলাচল


 সবাই চরিত্র বিক্রি করছে

 আমরা শুধু খণ্ড খণ্ড চরিত্র সেলাই করছি

 আমাদের চরিত্ররা বাউল হয়ে যাচ্ছে


 এই মায়াভুবনের মানববাগানে

 কামনার বিসর্পিল সর্পগুলি

 শুধু গর্ত খুঁড়ে চলেছে সীমাহীন অন্ধকারের দিকে



নিমাই জানা

তিনটি কবিতা


(১) বাৎসায়ন ও ফিজিওলজির পাঠ



প্রজাপতি হত্যার পর ব্রহ্মা এসে বসলেন আগুন আর স্বাহা নারীর কাছে
প্রতিটি প্রহর জুড়ে ধনাত্মক কার্নিভোরাসেরা ফিজিওলজির খাতাটি ভরিয়ে ফেলছেন লবণাক্ত রঙের আকাশ দিয়ে
দ্বিপদ উপপাদ্যের লিঙ্গহীন পুরুষেরা ফিউচার পার্ফেক্ট কন্টিনিউয়াস ভেঙে ভেঙে একটি পাথরের থালা তৈরি করবে যেখানে ইলোরা নারীটি বাৎসায়ন পাঠ করিয়ে যাবে অ্যারিস্টোটলকে, একটি পাথরের শিল্পী ময়ূরীর ডান পালককে ক্রুশবিদ্ধ করছেন গন্ধরাজের ছিদ্রালো বোঁটা দিয়ে
মরুদ্যানের ঘোড়াটি নেমে আসার পর বিশুদ্ধ পালকগুলো জড়িয়ে ধরবে একটি আনাস্তেসিয়া নারীটির ডান স্তন ,
প্রতিটি স্তনে তার ম্যালিগনেন্সি কালো কর্দমাক্ত পোকা কিলবিল করে খাচ্ছে স্নানঘরের পিচ্ছিল ধোঁয়াকে
আমি বৃষ্টি দানাকে ভয় পাই একটি অশ্বমেধ ঘোড়ার মতো , দক্ষ রাজার ত্রিশূল নিয়ে নিজের হৃদপিণ্ড ফুটো করছি সতী চিহ্নের জন্য
আমার সহস্রকাল জুড়ে রজঃস্রাব ঘটেনি


(২) শতকহীন চিতাকাঠ  ও পঞ্চপান্ডব গর্ভাশয়



যারা গভীর রাতে আলপথ ধরে নেমে যায় তাদের ডান হাতের কমন্ডুলটি সাদা কাগজের মতো চৌকো
প্রতিটি বর্গক্ষেত্রের অন্তরীক্ষে বাসা বেঁধে আছে প্রাচীন স্বরলিপি আমি তাদের ক্ষতিগ্রস্ত মুখের বামদিকে ফুটিয়ে চলি কিছু ধোঁয়াহীন ধূপ ,
জ্বেলে দিলাম প্রদাহ শ্মশান ক্ষেত্রের এক চন্দ্র , একমাত্র সাক্ষী রেখেছিল তার শতকহীন চিতা কাঠের জন্য
নিজের দেহে রাখা পুরুষের ওপর বিষধর পরাক্রমীরা বিষ প্রয়োগ করছে প্রতিটি রাতে
দ্রৌপদীর পাঁচটি গর্ভাশয় ছিল পঞ্চপান্ডবের জন্য
অর্জুনের বাকল আমাকে হত্যা করতে উদ্যত অথচ আমি একটি মাছের মতো ঠোঁটে নিয়ে শুয়ে আছি সারারাত
আমার পালকের উপর কোন জেরুজালেম শহরের যুবতী নেই,  যারা প্রতিটি আলপথ ভেঙে ভেঙে কম্বোজের পেঁচানো গোখরো হয়ে যায় তার  নিচে বৃত্তাকার শুয়ে থাকি গোপন প্রস্থচ্ছেদ নিয়ে সেখানের আয়নাটি আরো প্রাচীন
আমাকেই দাঁড় করায় ডটেড এক্সট্রা টাইম সঙ্গম চিত্রের কাছে,  প্রতিটি রাতে আমি অসহায় হয়ে বেরিয়ে আসি একটি উলঙ্গ ঈশ্বরীর পেছন থেকে
প্রতিটি দাঁত আসলে অজুত বিনাইন অজগরের নাম

(৩) লিঙ্গদণ্ডের আত্মহত্যা ও শতানীক


আমার সারা দেহে ভেজা ঈশ্বরীর কালো রং, যৌনাঙ্গ চিহ্ন মানেই মাথায় শিউলিপুর অথবা উন্মত্ত সাঁকো ঘাট নোনা হতে হতে কালিদহের ভেতর সঙ্গম করছে সহস্র কামদেব
ধর্মক্ষেত্রের দিকে চলে যাওয়ার পর রাসায়নিক দেহ ঘরের ভেতর আমার বাবা চৌকো রঙের একটি ধুতি পরে দাঁড়িয়ে আছে বেগনভেলিয়া ফুলের দলমন্ডল নিয়ে
প্রতিটি লিঙ্গদন্ডের আত্মহত্যা আসলে একটি বাকল মোচনের নাম
পায়ের ছাপের নিচে আরো কৃষ্ণবর্ণ হয়ে ওঠে চাঁদ
গোপন ঘরের ভেতর যে একাকী থাকে সে মহাজাগতিক আলো শুষে নিচ্ছে দ্রাঘিমাহীন ইচ্ছামতীর নারীর মতো
তার কপালের কাছে অদৃশ্য দুটো নৌকো আমাকে মৃৎশিল্পী করে গেছে আজীবন কপর্দকহীন করে
আমি ধনাত্মক সংখ্যা রেখার উপর দাঁড়িয়ে ঈশ্বরীর অজন্তা শরীর নিয়ে ক্রমশ পূর্ণ সংখ্যার মানুষগুলোকে গিলে খেলাম
গিরিখাতের পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে আমাদের অন্তিম বাসনার কাহিনী, বিষ্ণুপুরাণ
কোন সংঘাতের কারণ নেই বলে ভেসে আসছেন সমুদ্রের কিনারে নাভি বের করবেন ব্রহ্মা নিউক্লিওলাস থেকে
আমরা জয়ঘণ্টা বাজাবো নকুল আর শতানীক হয়ে

অমিত চক্রবর্তী

 রঙচটা


ভিজে রাস্তায় তেলের প্যাচ

আসলেই চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া বুদবুদ কিন্তু সে

অন্তত আলো তাই ভাবে

যখন বাহার তৈরি করে সঞ্চারে বা ব্যতিচারে,

যেন ফেনা, যেন প্রজাপতির পাখায় পাখায়

রঙমশাল।

  একই কৌশল আলোর, কিন্ত ঘৃণিত

হয়ে ওঠে তেলের প্যাচ বা ভেজা রাস্তায় পেট্রোল,

মুখ থুবড়ে তেল, সিঙ্কে ব্যাড়বেড়ে

চামচ, হাতা, লম্বা সরু কাচের গেলাস।


 ঘৃণিত হয়ত পাখায় রং বেশি বলে

অথবা জলের সম্মেলনে বিদেশি বা রঙচটা,

অন্যরকম ভাষা, অন্যরকম অ্যাকসেন্ট।

তারপর ঘৃণা শেষ হলে,

সাবান জলে ধুয়ে গেলে সেই প্যাচ,

তারা এখন ধূপধুনো দেয় রোজ, গান গায় বেসুরো, বেতাল,

শেষে একটা স্ট্যাচু বানায় স্মরণে - বাহারী

রঙের অনেক ছোপছোপ সারা গায়ে,

দাঁড় করানো চৌরাস্তার মোড়ে।



সব্যসাচী পণ্ডা

 আততায়ী

 

তোমার দুচোখে স্থির অপলক মায়া

যেন অনন্ত সন্ধানে ভেসে গেছে সব 

দুএকটি চুলের দীর্ঘ ক্লান্তিহীন যাতায়াত সে মুখে

সরিয়ে দেব ভাবি কতবার।...


এ হাত আততায়ী,অপরাধী, এই ভেবে সরিয়ে নিই বারংবার।




∆ ৩০ জানুয়ারি,২০২১।১৬ মাঘ,১৪২৮।রবিবার।সন্ধে ৭.৪০টা।পাঁচমুড়া,বাঁকুড়া।

গুচ্ছ কবিতা।।তৈমুর খান ।।

সমস্ত যুদ্ধের পর   অনেক মৃত্যুর পর এই বেঁচে থাকা  হেসে ওঠে মাঝরাতে  কোনও পিয়ানোর সুরে  খোলাচুল উড়ে আসে তার  বুকের ভেতর থেকে জ্যোৎস্নার ফণা ...